ভালোবাসার পাঁচ ভাষা: দাম্পত্য সুখের ভিত্তি

Updated: Nov 18, 2020

আমরা সমাজের সবার সাথে মেলামেশা করি। তাদের সাথে কাজ করি। কথাবার্তা হয়, আলাপ আলোচনা হয়। এ ভাবেই আমাদের চারপাশের মানুষজনের সঙ্গে সব সময়ই চলছে ভাবের আদান প্রদান। এ আদান-প্রদান চলছে কথা এবং কাজের মধ্য দিয়ে । বন্ধুত্ব এবং পারস্পরিক সম্পর্কের বন্ধনকে জোরদার করতে, এগিয়ে নিতে পারি একমাত্র ইতিবাচক আবেগ দিয়ে। কথা ও কাজের মধ্য দিয়েই এ আবেগের সৃষ্টি হয় বা সৃষ্ট আবেগ বৃদ্ধি পায়।



দাম্পত্য জীবনের জন্য কথাটা আরও বেশি সত্য। ভালোবাসার সফল পরিণতি ঘটেছে বিয়ের মধ্য দিয়ে। কারও কারও ক্ষেত্রে ভালোবাসার জগতে ঢোকার প্রথম সিংহদ্বারই হলো বিবাহ। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, বিয়ের প্রথম দিনগুলোতে ভালোবাসার যে গাঢ় ছাপ থাকে, তা কয়েক মাস বা বছর পরে আর থাকছে না। শেষ পর্যন্ত স্বামী-স্ত্রী এক ছাদের নিচে থাকলেও তাদের মধ্যে আর কোনও আত্মিক বন্ধন আর থাকে না। স্বামী-স্ত্রী এ অবস্থায় পাশাপাশি চললেও তাদের জীবন আর একতালে চলে না। মনে হয় দাম্পত্য জীবনের প্রেমপাত্রের সুধারস নি:শেষ হয়ে গেছে। জ্বালানি ছাড়া গাড়ি যেমন চলতে পারে না, একই ভাবে জীবনের প্রেমপাত্রে সুধারস না থাকলে দাম্পত্য জীবনের গাড়ির পথচলা বন্ধ হয়ে যাবে। এ অবস্থায় জীবনের গতি থাকবে না, থাকবে শুধু অভিনয়।

বিবাহ সংক্রান্ত উপদেষ্টা গ্যারি চ্যাপম্যান এ সমস্যা ও তা থেকে বের হয়ে আসার উপায় নিয়ে তার বইতে তিনি রোমান্টিক ও প্রেমপূর্ণ সম্পর্কের বিষয়ে মানুষকে সচেতন করে তুলা নিয়ে পাঁচ দিগনির্দেশনা দিয়েছেন। এ পাঁচ দিগনিদের্শনাকে পাঁচ ভাষা হিসেবে উল্লেখ করেন চ্যাপম্যান।

বইয়ে চ্যাপম্যান বলেন, ভালোবাসা প্রকাশের ক্ষেত্রে প্রতিটি মানুষই দু’রকমের পথ বা ভাষার আশ্রয় নেন।

ভালোবাসার প্রাথমিক এবং দ্বিতীয় ভাষা কথাটা চট করে জটিল মনে হতেই পারে। তারও সহজ উদাহরণ দেয়া যায়। ধরুণ বাংলাদেশে সাধারণ ভাবে সবারই প্রাথমিক বা আদিভাষা হলো বাংলা। তারপর দ্বিতীয় ভাষা হিসেবে দেশটিতে জোরদার হয়েছে ইংরেজি। একই ভাবে কারও কারও একাধিক বা দ্বিতীয়, তৃতীয় ভাষাও থাকতে পারে। সবারই একের অধিক ভাষা জানা থাকবে – সে কথা সব সময়ই সত্য নয়। অনেকেই প্রাথমিক ভাষাই কেবল জানে। সাধারণ ভাবে একজন মানুষ প্রাথমিক ভাষায় সহজের ভাবের আদান-প্রদান করতে পারে। বা এতে স্বাচ্ছন্দ বোধ করে। চেষ্টা, অনুশীলনের মধ্য দিয়েই মানুষ কেবল দ্বিতীয় ভাষা আয়ত্ত করে। প্রতিদিনের ব্যবহারের মধ্য দিয়ে এতে দক্ষতা অর্জন করে বা স্বাচ্ছন্দ বোধ করে।


দ্বিতীয় ভাষা জানে না এমন ব্যক্তি অন্য ভাষাভাষী মানুষের সংস্পর্শে এলে কি ঘটবে? অর্থাৎ বাংলা জানা ব্যক্তির সঙ্গীর ভাষা যদি চীনা হয়। বাংলা জানা ব্যক্তি যদি চীনা ভাষা না জানেন। কিংবা চীনাভাষী সঙ্গীর যদি বাংলাজ্ঞান না থাকে। তা হলে? হ্যাঁ তখন ভাব বিনিময়ের জন্য তাদের দু’জনকেই ইংগিত, ইশারা, মুকাভিনয় বা ছবির আশ্রয় নিতে হবে। এতে চলবে সীমিত পর্যায়ে ভাব বিনিময় । তবে সহজ সাধ্য হবে না। বা হবে না আরামদায়ক। কাজেই ভিন্ন ভাষাভাষীর সঙ্গে ভাব বিনিময় করতে হলে আমাদেরকে সে ভাষা শিখতে হবে।


প্রেম বা ভালোবাসার ক্ষেত্রেও একই কথা সমান ভাবেই সত্যি। আবেগ প্রকাশের বা ভালোবাসা জানানর কিংবা প্রেমের কথা বলার আপনার ভাষাটি আপনার সঙ্গীর ভাষার থেকে ভিন্নতর হতেই পারে। একটু আগেই চীনা ভাষা ও বাংলা ভাষা নিয়ে যে কথা বলছিলাম। তাই যদি এখানেও ঘটে? তা হলে কখনই, ভালোবাসা বা প্রেমের গভীর বা সুক্ষ্ম অনভূতির কথা আর প্রকাশ করা যাবে না। প্রেম বা ভালোবাসার প্রতি আন্তরিক অঙ্গীকারবদ্ধ হয়েও এখানে কোনও ফায়দা হবে না। অনভুতির গভীর কথাটি বলার জন্য আপনাকে এমন পরিস্থিতিতে সঙ্গীর ভালোবাসার প্রাথমিক ভাষা আপনাকে জানতে হবে।

৩৫ বছরেরও বেশি সময় ধরে বিবাহ সংক্রান্ত উপদেষ্টা বা ম্যারেজ কাউন্সেলর কাজ করার মধ্য দিয়ে গ্যারি চ্যাপম্যান মনে করেন, মানুষ সাধারণত পাঁচ ভাবে আবেগ, ভালোবাসা বা প্রেমকে প্রকাশ করেন। কিংবা পাঁচ ভাবে প্রকাশিত আবেগ, ভালোবাসা বা প্রেমকে বুঝতে পারেন।য

সহজ কথায়, তিনি পাঁচটি বিষয় তুলে ধরেছেন। যে সব পথে মানুষ ভালোবাসা অর্জন করতে বা স্বীয় অভিজ্ঞানকে ব্যাখ্যা করতে পারে। সে সব আকার,ইঙ্গিত, চাল-চলন বা অঙ্গ-ভঙ্গি ভালোবাসাকে জাগিয়ে তোলে কিংবা ব্যাখ্যা করতে সহায়তা করে তাকেই তিনি ‘ভালোবাসার ভাষা’ হিসেবে নাম দিয়েছেন।


গ্যারি চ্যাপমান মনে করেন এ কথা ভালোবাসার ভাষার ক্ষেত্রেও সমান ভাবে খাটে। ভালোবাসার ভাষায় মনোভাব প্রকাশের তখনই সীমাবদ্ধ হবে যখন আপনার কল্পনা শক্তি সীমিত হয়ে পড়বে বলেও মনে করেন তিনি। সে যাই হোক, নিজ সঙ্গীর ভালোবাসার ভাষায় মনোভাব প্রকাশ করাটাই এখানে গুরুত্বপূর্ণ। তিনি তার অভিজ্ঞতার আলোকে দেখতে পেয়েছেন, সাধারণত স্বামী ও স্ত্রী একই ভালোবাসার ভাষায় মনোভাব প্রকাশ করেন না। সঙ্গী যখন সে ভাষার সঠিক অর্থ বুঝতে পারেন না তখনই দাম্পত্য জীবনে খটকা লাগতে থাকে। চলতি কথায়, কেউ কেউ একে গিরিংগি বা গ্যাঞ্জামও বলতে পারেন। একজন ভালোবাসার কথা বলছেন কিন্তু তার সে ভাষা জানা থাকায় অপর জন তা বুঝতে পারছেন না। গ্রাম বাংলায় প্রচলিত একটি কথা আছে, বাবায় আমার শিখা আইল কি যে ‘ইংরাজি’, ‘ওয়াটার’ ‘ওয়াটার’ করতে প্রাণটা দিলি! যে জনগোষ্ঠী ইংরেজির ইও জানে না, তাদের কাছে ‘ওয়াটার’ ‘ওয়াটার’ বলে হাজার চিৎকার করে করে পিপাসায় প্রাণ দিলেও পানি পাওয়া যাবে না।কিংবা সেই হতভম্ব সঙ্গীর কথাই ভাবুন, অনেক কথাই বলা হলো কিন্তু কোন কথাই বলা হলো না ভেবে যে আপেক্ষ করছে, ‘অনেক কথা যাও যে বলে কোনো কথা না বলি। তোমার ভাষা বোঝার আশা দিয়েছি জলাঞ্জলি!’


আজকাল ভালোবাসার সম্পর্কের ক্ষেত্রে টানাপড়েনের প্রধান কারণটি হলো, নারী বা পুরুষ যেই হোন না কেন তার প্রত্যাশা দাম্পত্য জীবনে তার প্রত্যাশা পূরণ হয় না। দাম্পত্য জীবনে তার একান্ত প্রত্যাশা হলো প্রিয়জন তাকে নির্দিষ্ট পন্থায় ভালোবাসবে। সুনির্দিষ্ট ভাবে তার চাওয়া-পাওয়া পূরণ করবে। বাস্তবতা হলো, তার সে চাওয়া-পাওয়া পূরণ হয় না। এবারে আপনি নিজেই বুঝতে পারছেন এর কারণ। আপনি বুঝতে পারছেন যে, প্রত্যেক মানুষের ভালোবাসা আদান প্রদান করার ক্ষেত্রে নিজস্ব প্রাথমিক ভাষা রয়েছে। প্রথমেই সে ভাষা বুঝতে হবে। আপনি এবং আপনার সঙ্গী যেন পরস্পরকে ভালোভাবে বুঝতে পারেন, ভুল বোঝাবুঝির শিকার না হ’ন সে দিকে লক্ষ্য রেখেই গড়ে তোলা হয়েছে এই ‘ভালোবাসার পাঁচ ভাষা।’

জীবনে বিশেষ করে দাম্পত্য জীবনে ভালোবাসা নিয়ে যারা সমস্যায় পড়েছেন তাদের সে সংকট কাটিয়ে উঠতে সচেষ্ট হতে এবং সহায়তা করতেই ‘ভালোবাসার পাঁচ ভাষা’র কথা তুলে ধরেছেন গ্যারি

চ্যাপমান। এই পাঁচ ভাষা জানা থাকলে এর সঙ্গে জড়িত উপভাষা, লবজ, স্থানীয় বা আঞ্চলিক এবং কথ্য ভাষাগুলোর অর্থ বুঝতে অসুবিধা হবে না।


প্রশংসা করতে শিখুন:

একে অপরের প্রশংসা করতে শিখুন

খ্যাতনামা লেখক মার্ক টোয়াইনের নাম শোনেনি এমন শিক্ষিত লোকের সংখ্যা খুবই কম। মজার ভঙ্গিতে কথা বলায় ওস্তাদ ছিলেন। বই সংগ্রহের পন্থা সম্পর্কে তার মজার কথা অনেকেই জানেন। প্রশংসা প্রসঙ্গে তিনি বলেছেন, ‘তার সহধর্মিনী যদি একবার প্রশংসা করে, তার জোরে দুই মাস চলতে পারব।’ মার্ক টোয়াইনের কথা শাব্দিক ভাবে নিলে ধরে নিতে হবে যে আমাদের প্রেমপাত্র সুধারসে পরিপূর্ণ রাখার জন্য বছরে ছয়বার প্রশংসা করলেই চলবে। তবে, আপনি বা আপনার সঙ্গী মোটেও মার্ক টোয়াইন নন। নন তার ভাব শিষ্যও। তাই আপনার জীবন সুন্দর ভাবে চালাতে হলে বছরে ছয় দফা চেয়ে আরও বেশি প্রশংসার প্রয়োজন পড়বে।

প্রশংসা করার সময়ে সঙ্গীর গুণের দিকে নজর রাখুন।


সব মানুষেরই কিছু গুণ আড়ালে থাকে। চট করে নজরে পড়ে না। আপনার সঙ্গীর বেলায়ও কথাটা সত্য। প্রশংসা করার সময়ে এই গুণ বা গুণাবলীর কথা তুলে ধরুন। আমাদের আকবর (সঙ্গত কারণেই নাম পরিচয় বদলে দেয়া হয়েছে) নামের এক বন্ধু চেহারা-সুরতে মোটেও ভালো ছিল না। বাংলাদেশে পরীক্ষার ভবদরিয়া পার করার জন্য গ্রেস মার্ক দেয়ার চল ছিল এককালে। এই রকম গ্রেস মার্ক উদার হাতে দেওয়া হলেও আকবরের চেহারাকে চলনসই পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া যাবে না। কিন্তু কেবল কলেজের নয় শহরের দুর্দান্ত সুন্দরী ইভা গভীর ভাবে আকবরের প্রেমে পড়ে গেল। তা শেষ পর্যন্ত পরিণয় পর্বে যেয়ে শেষ হয়। অত:পর তারা সুখে শান্তিতে ঘরকন্না করতে লাগল। আকবরের প্রতি কি করে আকর্ষণ সৃষ্টি হলও তাদের এক বিয়ে বার্ষিকীতে জানতে চেয়েছিলেন নানা সম্পর্কের প্রবীণ এক রসিক মুরব্বী। জবাবে ইভা ভাবী বললেন, ‘-আমি দেখতে অন্যদের তুলনায় ভালো এ কথা জ্ঞান হওয়ার পর থেকেই শুনছি। ফলে ও কথার কোনও দাম নেই আমার কাছে। আর এই লোকটা (আকবর দেখিয়ে বলল) প্রথম প্রশংসা করল আমার হাতের লেখার। দ্বিতীয় কথাটা ছিল, বাহ! লেখার হাতও হাতের লেখার মতোই উত্তম! অনেক ঘাম ঝরিয়ে এ সব রপ্ত করতে হয়েছে!’ বলে জবাবের অপেক্ষা না করে লোকটা চলে গেল।’ ভাবী থামলেন না, আরও বললেন, -‘সত্যিই হাতের লেখা সুন্দর করার এবং গুছিয়ে ভাব প্রকাশের, সে রচনা, সারমর্ম বা সারাংশ যাই হোক না কেন, জন্য প্রচণ্ড খাটতে হয়েছে। খুব ছোট বয়স থেকেই খাটতে হয়েছে। আমার বাবার হাতের লেখা চমৎকার। আমার মায়ের হাতের লেখা তার দুধে-আলতায় মেশান গায়ের রংয়ের মতই সবার নজর কাড়ে। আমার নানী দেখতেই কেবল সুন্দরী নন, বরং তার হাতের লেখা বাঁধিয়ে রাখার মতোই। নানার হাতের লেখা সে তুলনায় কিছুই না। কিন্তু সাধারণ মানুষের হাতের লেখার সঙ্গে তুলনা করলে তাকেও ভালো বলতেই হবে। এতো কষ্ট করে হাতের লেখা ও লেখার হাত রপ্ত করেছি খুব কম মানুষ তার প্রশংসা করে, সবাই আমার চেহারা দেখে হাতের লেখা বা লেখার হাত নিয়ে কথা বলে না।’

নানা হাসতে হাসতে বললেন, ‘-হাতের লেখা আর লেখার হাতের প্রশংসা করে একেবারে হাতে হাতে ফল পেয়েছে আকবর বাদশাহ!’

সঙ্গীর প্রাপ্য প্রশংসা করে এমন ফল জীবনভর আপনিও পেতে পারেন।

প্রশংসা যেন প্রকট চাটুকারিতা বা মিথ্যা স্তুতিবাক্যে পরিণত না হয় সে দিকে খেয়াল রাখতে হবে। না হলে হিতে বিপরীত হবে। আপনার কথা সঙ্গীর কাছে মূল্যহীন, ফাঁপা শব্দমালা হয়ে উঠবে।

যথার্থ এবং প্রাপ্য প্রশংসা বাক্য ভালোবাসা প্রকাশের শক্তিশালী পদ্ধতি হয়ে উঠতে পারে। সত্যি বলতে কি, প্রশংসার মধ্য দিয়ে আপনি সঙ্গীর তৎপরতার প্রতি আপনার সম্মতি প্রকাশ করছেন। তার কাজকর্মকে অনুমোদন দিচ্ছেন। মূল্যায়ন করছেন তাকে।

  • তাকে বলুন, প্রতিটা ভোরে তোমাকে পাশে দেখতে পাবো ভেবেই ঘুম ভাঙ্গে।

  • আমার পাশে আছো, আমাকে প্রেরণা যুগিয়ে চলেছ- এ জন্য যতই ধন্যবাদ দেই না কেন তা কমই হবে।

  • তোমাকে ভালোবাসি!

হ্যাঁ সুযোগ পেলেই শেষ কথাটা বলবেন। বা শেষ কথাটা বলার সুযোগ সব সময়ই সৃষ্টি করবেন।





34 views0 comments

5-MinsSolution

Contact us

Tel: +8801713221592

Dhaka, Bangladesh

  • Facebook

Follow us on Facebook